বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করা এবং মানবকল্যাণে অনন্য অবদানের জন্য নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মুকুটে যুক্ত হয়েছে আরও এক বর্ণিল সংযোজন। সম্প্রতি তাঁর প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’। এই অর্জনের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— দীর্ঘ কর্মজীবনে ঠিক কতগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ড. ইউনূস? এবং এই বিশেষ ‘হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ তাঁর অর্জনের মুকুটে কীভাবে নতুন মাত্রা যোগ করল?
আজকে আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তুলে ধরব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, তাঁর বিশ্বজুড়ে প্রাপ্ত স্বীকৃতি এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তাঁর অর্জিত পুরস্কারের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটনের নামে প্রবর্তিত এই অ্যাওয়ার্ড সাধারণত সেই সমস্ত বিশ্বনেতা, উদ্যোক্তা এবং সমাজসংস্কারকদের প্রদান করা হয়, যারা নারী empowerment (ক্ষমতায়ন), শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক পরিবর্তনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এই পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে মূলত তাঁর দীর্ঘদিনের সামাজিক ব্যবসা (Social Business) ধারণা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি দরিদ্র মানুষকে—বিশেষ করে নারীদের—স্বাবলম্বী করে তোলার প্রচেষ্টাকেই সম্মান জানানো হয়েছে।
হিলারি ক্লিনটন নিজেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ড. ইউনূসের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই পুরস্কার প্রাপ্তি কেবল ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘ ও কর্মমুখর জীবনে তিনি দেশি-বিদেশি মিলে শতাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। সুনির্দিষ্ট সংখ্যাটি নিরূপণ করা বেশ কঠিন, কারণ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকার নিয়মিতভাবেই তাঁকে নানা সম্মাননায় ভূষিত করে চলেছে।
তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ড. ইউনূসের ঝুলিতে রয়েছে:
সহজ কথায়, বিশ্বজুড়ে শান্তিতে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদের প্রাপ্ত পুরস্কারের ঝুলি এতটাই সমৃদ্ধ যে, তা গণনা করা এক ঐতিহাসিক দলিল তৈরির সমান।
ড. ইউনূসের পুরস্কার প্রাপ্তির ইতিহাস মূলত ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে চট্টগ্রামে তাঁর ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর দিন থেকেই শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে জোবরা গ্রামে দরিদ্র নারীদের মাঝে সামান্য কিছু টাকা ঋণ দিয়ে তিনি যে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ নামক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।
প্রাথমিকভাবে বিশ্বব্যাংক বা প্রচলিত অর্থনীতিবিদরা তাঁর এই মডেলকে অবমূল্যায়ন করলেও, এর কার্যকারিতা দ্রুত বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে। ১৯৯০-এর দশক থেকে ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রথম সারির আন্তর্জাতিক পুরস্কারগুলোর একটি পেতে শুরু করেন।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক মোড় নেয় ২০০৬ সালে, যখন নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নোবেল জয়। এই পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি শুধু ক্ষুদ্রঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ‘সামাজিক ব্যবসা’ (Social Business) ধারণার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
ড. ইউনূস কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি দর্শনের নাম। দারিদ্র্য বিমোচন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মানবিক রূপান্তর এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে সামাজিক উদ্যোক্তা হওয়ার যে প্রেরণা তিনি জুগিয়েছেন, তা আজকের বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
যখনই কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ব্যক্তি হিসেবে হিলারি ক্লিনটন বা অন্য কোনো বিশ্বনেতা তাঁকে সম্মানিত করেন, তখন তা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের কাজের স্বীকৃতি হয়ে ওঠে। এই পুরস্কারগুলো প্রমাণ করে যে, ছোট একটি আইডিয়াও কীভাবে পুরো পৃথিবীর মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
আমাদের স্থানীয় তরুণ সমাজ ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য ড. ইউনূসের এই অর্জন এক বিশাল প্রেরণা। বারবার বাধা বিপত্তি এবং দেশীয় নানা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যেও ড. ইউনূস যেভাবে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন এবং বিশ্বজুড়ে সম্মানিত হয়েছেন, তা আমাদের শিখায় যে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করলে বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা সম্ভব।
‘হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঝুলিতে যুক্ত হওয়া সর্বশেষ বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলোর একটি। তাঁর মোট অর্জিত পুরস্কারের সংখ্যা হয়তো শতকের ঘর ছাড়িয়ে অনেকদূর চলে গেছে, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা। ইতিহাস ড. ইউনূসকে কেবল একজন ব্যাংকার বা অর্থনীতিবিদ হিসেবে মনে রাখবে না, বরং তাঁকে স্মরণ করা হবে একজন ‘শান্তির দূত’ ও ‘মানবতার সংস্কারক’ হিসেবে।