‘নিরীহ’ শব্দটি জীববিজ্ঞানের কঠোর পরিভাষায় সরাসরি ব্যবহার করা হয় না। তবে আচরণগত বিজ্ঞান (Behavioral Ecology), বিবর্তনবাদ এবং বাস্তুসংস্থানের (Ecology) ভাষায় এমন কিছু প্রাণীর সন্ধান মেলে, যাদের আত্মরক্ষার কোনো আগ্রাসী কৌশল নেই, যারা মানব বা অন্য কোনো প্রজাতির জন্য ন্যূনতম হুমকি নয় এবং যাদের সম্পূর্ণ জীবনচক্র শান্ত ও অহিংস প্রকৃতির। সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে—পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ প্রাণী আসলে কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে প্রাণীর আচরণগত জটিলতা এবং তাদের টিকে থাকার সংগ্রামের এক অদ্ভুত জগতে। গবেষকদের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ এবং নৃতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত তথ্যের ভিত্তিতে আজ আমরা বিশ্লেষণ করব এমন কিছু প্রাণীকে, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত এবং নিরীহ জীব হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিদার।
গবেষকদের মতে, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅঞ্চলের বৃক্ষবাসী স্তন্যপায়ী প্রাণী ‘স্লথ’ (Sloth) পৃথিবীর অন্যতম নিরীহ প্রাণী। এদের সমগ্র জীবনটাই এক ধীরগতির ধ্যান।
জলজ প্রাণীদের মধ্যে ‘মানাটি’ বা জলহস্তীর মতো দেখতে এই সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীটিকে ‘সি কাউ’ (Sea Cow) বলা হয়। এরা জলজ তৃণভোজী প্রাণী।
অস্ট্রেলিয়ার আইকনিক প্রাণী কোয়ালা মূলত ইউক্যালিপটাস পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করে।
বিবর্তনের ধারায় টিকে থাকার জন্য প্রাণীরা সাধারণত দুটি পথ বেছে নেয়—‘ফাইট অর ফ্লাইট’ (Fight or Flight) অর্থাৎ লড়াই করা অথবা পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু নিরীহ প্রাণীগুলো এই উভয় পথই পরিহার করে ভিন্ন কৌশল বেছে নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যে প্রাণীগুলো সম্পূর্ণ নিরীহ, তাদের বিবর্তন ঘটেছে এমনভাবে যেখানে তারা শিকারী প্রাণীদের খাদ্য শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। যেমন:
সাধারণ মানুষ অনেক সময় খরগোশ, হরিণ বা ভেড়াকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ প্রাণী বলে মনে করেন। কিন্তু গবেষকদের মতে, প্রজনন ঋতুতে পুরুষ হরিণ বা ‘স্ট্যাগ’ (Stag) অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, মৌমাছি বা পিঁপড়েরা আপাতদৃষ্টিতে ছোট এবং নিরীহ মনে হলেও কলোনি রক্ষার্থে তারা প্রাণঘাতী আক্রমণ চালাতে পারে।
তাই বিজ্ঞানীরা এককভাবে কোনো একটি প্রাণীকে ‘পরম নিরীহ’ ঘোষণা করতে নারাজ। তবে সামগ্রিক আচরণ, শারীবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য এবং আগ্রাসনের অনুপস্থিতির বিচারে স্লথ এবং মানাটি যৌথভাবে এই তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে।
বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই শান্ত ও নিরীহ প্রাণীগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।
মানুষের আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসনে আজ এই শান্ত ও নিরীহ প্রাণীগুলো সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, বাসস্থান ধ্বংস এবং মানুষের অসাবধানতার কারণে স্লথ, কোয়ালা ও মানাটি আজ অস্তিত্বের সংকটে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই নিরীহ প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা করা কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্যই নয়, বরং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের নৈতিক সৌন্দর্যের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। পৃথিবী মানুষের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়—এই শান্ত প্রাণীদের নিঃশব্দ উপস্থিতিই প্রকৃতির প্রকৃত সৌন্দর্য ও শান্তি বজায় রাখে।