মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বোম্বে হাইকোর্টে এ-সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইমরান খানের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। আদালতও বিতর্কিত নির্দেশটির কার্যকারিতা স্থগিত রেখে আগামী ২ নভেম্বর বেলা ৩টায় পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
বোম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মহেশচন্দ্র ত্রিপাঠী ও বিচারপতি অদ্বৈত শেঠনার সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে।
ইমরান খানের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ভেঙ্কটেশ ধোন্দ আদালতে জরুরি শুনানির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এফআরআরওর নির্দেশ অনুযায়ী বুধবারের মধ্যেই অভিনেতাকে ভারত ছাড়তে হতো। ফলে দ্রুত শুনানি না হলে তিনি তাৎক্ষণিক আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অনিল সিং মামলার শুনানির জন্য আরও সময় চান। একই সঙ্গে তিনি আদালতকে আশ্বস্ত করেন, পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইমরান খানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
এরপর আদালত মামলার কার্যক্রম ২ নভেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করেন এবং ভারত ছাড়ার নির্দেশের কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত রাখেন।
কেন ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল
মার্কিন নাগরিক ইমরান খানের কাছে ভারতের ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ড রয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর মুম্বাইয়ের বিদেশি নাগরিক নিবন্ধন দপ্তর তাঁকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
অভিযোগের সূত্রপাত একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে ইমরান খান অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
গত ১০ অক্টোবর মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানের কাছে অভিনেতাকে আটক করে পুলিশ। সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সঙ্গী লেখা ওয়াশিংটন, মা নুজহাত এবং চাচাতো বোন জয়ন মেরি খানসহ আরও কয়েকজন।
ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদে ওই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল।
প্রতিবাদকারীরা তুষার গান্ধীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রচারাভিযানে সমর্থন জানাচ্ছিলেন। তাঁদের অন্যতম দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ।
ঘটনার পর বিজেপি নেতা কিরীট সোমাইয়া ইমরান খানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ ছিল, বিদেশি নাগরিক হয়েও অভিনেতা ভারতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই এফআরআরওর পক্ষ থেকে তাঁকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতে নির্দেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
এফআরআরওর সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি দাবি করে গত ১৭ অক্টোবর বোম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেন ইমরান খান।
আবেদনে তিনি দাবি করেন, ভারতের ২০২৫ সালের অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক আইন কিংবা নাগরিকত্ব আইনের কোনো বিধান তিনি লঙ্ঘন করেননি।
তাঁর অভিযোগ, কোন নির্দিষ্ট আইনি বিধান ভঙ্গের কারণে তাঁকে ভারত ছাড়তে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নির্দেশে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ইমরানের আইনজীবীদের দাবি, নির্দেশ জারির আগে অভিনেতাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও পাননি তিনি।
যথাযথ তদন্ত ও শুনানির সুযোগ ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আদালতে দাবি করেছেন অভিনেতা।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার
রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন ইমরান খান।
আদালতে দাখিল করা আবেদনে তাঁর দাবি, তিনি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন সেখানে কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল না। পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে তিনি বিক্ষোভস্থলেও প্রবেশ করেননি।
বরং নিজের গাড়িতে ফিরে যাওয়ার সময় সংবাদকর্মীরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। এরপর পুলিশ তাঁকে আটক করে বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন অভিনেতা।
ইমরানের দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আবেদনে ভারতের সংবিধানের ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সংশ্লিষ্ট নির্দেশ তাঁর সমতা, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।
এ ধরনের নির্দেশ কার্যকর করা হলে তা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী হবে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ ও যুক্তির বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরলেন অভিনেতা
আদালতে দাখিল করা আবেদনে ভারতের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন ইমরান খান।
তিনি জানান, মাত্র দুই বছর বয়স থেকে ভারতে বসবাস করছেন। তাঁর পরিবার, শিক্ষা, বিয়ে এবং অভিনয়জীবনের সঙ্গে দেশটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
নিজের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই বলেও দাবি করেছেন অভিনেতা।
ওসিআই কার্ডধারী হিসেবে তাঁর আইনি অবস্থান যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ কারণে নির্দেশটি বাতিল করার পাশাপাশি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার আবেদন জানান ইমরান খান।
২ নভেম্বরের শুনানিতে নজর
আদালতের সাময়িক স্থগিতাদেশের ফলে আপাতত ভারত ছাড়তে হচ্ছে না ইমরান খানকে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা নির্দেশটি স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়নি।
আগামী ২ নভেম্বর পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য এবং অভিনেতার আবেদনের আইনি ভিত্তি নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ওসিআই কার্ডধারী একজন বিদেশি নাগরিকের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অভিযোগ এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার বৈধতা—মামলাটিতে এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফলে আপাতত স্বস্তি মিললেও ইমরান খানের আইনি লড়াই শেষ হয়নি। পরবর্তী শুনানিতেই স্পষ্ট হতে পারে, তাঁর বিরুদ্ধে জারি করা নির্দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে।