ঢাকাই চলচ্চিত্র এখনো প্রধানত শাকিব খান কেন্দ্রিক এবং ঈদের মতো উৎসবগুলোতে তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলোই আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকে। তবে চলচ্চিত্রের এই শাকিব-নির্ভরতার মূল দায় কার—তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি কর্তৃক আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় শাকিব খানের ব্লকবাস্টার ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার পরিচালক হিমেল আশরাফ স্পষ্ট জানান, সিনেমা সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি শক্তিশালী গল্প। গল্প যদি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়, তবে শাকিব খানকে না পেলেও মানসম্মত ও সফল সিনেমা নির্মাণ করা পুরোপুরি সম্ভব।
চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (DFP) মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত ‘আজকের চলচ্চিত্রে সংকট, করণীয় ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক উক্ত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে হিমেল আশরাফ ঢালিউডের অভ্যন্তরীণ নানা দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গল্প যখন শক্তিশালী হয়, তখন শাকিব খান না থাকলেও অনেক কিছু করা যায়। কিন্তু বর্তমানে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির প্রধান সমস্যা হলো ভালো গল্পকারের তীব্র অভাব। প্রধান নায়ক-নায়িকাদের পাশাপাশি শক্তিশালী সিনিয়র চরিত্রের শিল্পীরও চরম অভাব রয়েছে, যা মানসম্মত সিনেমা তৈরিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
ইন্ডাস্ট্রির কারিগরি ও মেধা সংকটের চিত্র তুলে ধরে হিমেল আশরাফ আরও বলেন, সিনেমা নির্মাণে দক্ষ কলাকুশলীর ভূমিকা অপরিসীম, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা অত্যন্ত সীমিত। তিনি আক্ষেপ করে জানান, ‘আগে আমাদের দেশে বড় মাপের আর্ট ডিরেক্টর ও খ্যাতিমান ক্যামেরাম্যানরা ছিলেন। কিন্তু এখন সিনেমা বানাতে বিজ্ঞাপন ইন্ডাস্ট্রি (অ্যাড এজেন্সি) থেকে অভিজ্ঞ ক্যামেরাম্যান নিয়ে আসতে হয়। তাঁদের বাজেট অনেক বেশি থাকে, তাঁরা একাই ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। অথচ আমাদের একটি চলচ্চিত্রের পুরো বাজেটই যেখানে সীমিত, সেখানে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।’ একই সঙ্গে সহকারী পরিচালকের জন্য প্রতিবেশী দেশ কলকাতায় যোগাযোগ করতে হয় উল্লেখ করে তিনি দেশে পেশাদার চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রতি জোর তাগিদ দেন, যেখান থেকে মেকআপম্যান, ক্যামেরাম্যান ও সহকারী পরিচালকদের নিয়মিত পেশাদার আগমন ঘটবে।
এই সভায় উপস্থিত থেকে অভিনেতা ও উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয় শাকিব-নির্ভরতা কাটাতে প্রযোজকদের নতুন মানসিকতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানান। জয় বলেন, ‘শাকিব খানকে নিয়ে যে বিশাল বাজেটে সিনেমা তৈরি করা হয়, সেই একই বাজেট নিয়ে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতাকে সুযোগ দিয়ে সিনেমা বানান। দেখবেন, সে-ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি শাকিব খান হয়ে উঠবে। ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে আমাদের মূল জায়গায় মনোযোগ দেওয়া উচিত। আমাদের মধ্যে বিতর্ক বা মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু চলচ্চিত্র রক্ষায় সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে এবং প্রয়োজনে সরকারের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে হবে।’
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে সিনেমার ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালু, সরকারি অনুদান প্রদান প্রক্রিয়া, আধুনিক চলচ্চিত্র নীতিমালা এবং হল পরিবেশনা ব্যবস্থাপনার মতো নানাবিধ সংকট ও সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য ও মতামত প্রদান করেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের বিশিষ্ট পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পী হেলাল খান, শিবা শানু, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, বদিউল আলম খোকন, আরশাদ আদনান, শাহরিয়ার শাকিল, ছটকু আহমেদ, শাহিন সুমন এবং শাহিন কবির টুটুলসহ আরও অনেকে।