জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, দলের প্রাথমিক আদর্শচ্যুতি, নারী অধিকার উপেক্ষা এবং সংগঠনে গণতন্ত্র চর্চার চরম অভাবের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও চাঞ্চল্যকর বিবৃতি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে দলের বর্তমান ভুল রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের তরুণ ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি নতুন ধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন এই নেত্রী।
দীর্ঘ বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন এনসিপি ছাড়ার নেপথ্যে প্রধানত চারটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরেছেন। নিচে কারণগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
সামান্তা শারমিন অভিযোগ করেন, প্রায় এক বছর আগেই এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা ছিল—জামায়াতে ইসলামী নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা রাখে না।
তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম জামায়াত ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই মিত্র হওয়ার যোগ্য না এবং তাদের সঙ্গে জোট করার জন্য এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে।”
জামায়াতের রাষ্ট্রদর্শন গণতান্ত্রিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জামায়াতকে যতটুকু সংস্কারের কথা বলতে দেখা যায়, ততটুকু বলে ২৪-এর আকাঙ্ক্ষাকে কুক্ষিগত করার প্রয়োজন থেকে, ভণিতা হিসেবে।” ৭১-এর গণহত্যার জন্য ক্ষমা না চাওয়ার মানসিকতা এবং দলীয় কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই জামায়াত রাজনীতি করছে বলে দাবি করেন তিনি। এনসিপি যখন জামায়াতকে সংস্কারের পথে বন্ধু হিসেবে বেছে নেয়, তখন উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ সংস্কারের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে তাঁর অভিমত।
২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেবল সাধারণ ক্ষমতা বদলের নির্বাচন না ভেবে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের উপলক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন সামান্তা শারমিন। তাঁর দাবি, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে এনসিপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে নিঃশেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, “এনসিপি ইতিহাসের এই শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘বড়’ রাজনৈতিক দলের লেজুড় হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করেছে।” নির্বাচনী জয়কে রাজনৈতিক জয়ের চেয়ে প্রাধান্য দেওয়ায় দলটির গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে নারীদের সম্মুখসারির ভূমিকা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে এনসিপি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারেনি বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, পুরোনো দলগুলোর ছাঁচ ভেঙে এনসিপির উচিত ছিল নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
তবে বাস্তবে তা না করে দলটির ভূমিকা নারীবিরোধী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গেই মিলে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশের অর্ধেকেরও বেশি নারীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বাদ পড়ে গেছে।
দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সাংগঠনিক সংস্কার নিয়েও তীব্র আপত্তি তুলেছেন সামান্তা। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মতো এনসিপিতেও কাউন্সিল এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
তিনি বলেন, “দলের কাউন্সিল না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি ‘রিস্ট্রাকচার’ দলের অভ্যন্তরের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যে প্রবণতা পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আছে।” যে দল নিজের ঘর সামলাতে এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিরপেক্ষতা বা গণতন্ত্রের দাবি কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্নও জোরালোভাবে তুলেছেন তিনি।