১৩ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার, ০৪:০৭:২৩ পূর্বাহ্ন


২৭ বছরে শেষ হয় হ্যাপির জীবনযাত্রা!
বিনোদন ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-১০-১২ ১৫:৩৭:৪৮
২৭ বছরে শেষ হয় হ্যাপির জীবনযাত্রা! বাংলা ব্যান্ডের কিংবদন্তি হ্যাপি আখান্দের জন্মবার্ষিকীতে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি I ছবি: সংগৃহীত


জিমি হেনড্রিক্স-কার্ট কোবেইনদের ‘ক্লাব টোয়েন্টি সেভেন’-এর অলিখিত সদস্য হ্যাপি আখান্দ্; জন্মবার্ষিকীতে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি

      জিমি হেনড্রিক্স, কার্ট কোবেইন, ব্রায়ান জোন্স, জ্যানিস জপলিন কিংবা অমর সিং চমকিলা—বিশ্বের সংগীত ও শিল্পকলা জগতের এমন ৭০ জনেরও বেশি ক্ষণজন্মা তারকাদের নিয়ে গঠিত এক রহস্যময় ও বেদনাবিধুর তালিকার নাম ‘ক্লাব টোয়েন্টি সেভেন’। চাইলেই এই ক্লাবের সদস্য হওয়া যায় না, এর জন্য প্রয়োজন হয় নিয়তির নির্মম ও অকাল মৃত্যুর অলিখিত সুপারিশ। আর সেই করুণ সুপারিশ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের অপার সম্ভাবনাময় ও প্রবাদপ্রতীম তরুণ প্রতিভাবান শিল্পী জিয়া হাসান আখান্দ্—যাঁকে বিশ্ব এক নামে চেনে ‘হ্যাপি আখান্দ্’ হিসেবে।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে জীবনের পাঠ চুকিয়ে ফেলা এই সুরের জাদুকরের আজ জন্মদিন। বেঁচে থাকলে গানে গানে ৬৪টি বসন্ত পেরিয়ে আজ ৬৫ বছরে পা রাখতেন তিনি। ১৯৬০ সালের ১২ অক্টোবর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পাতলা খান লেনের আখান্দ্ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হ্যাপি। তাঁদের পারসি পূর্বপুরুষদের মূল পদবি ছিল ‘আখান্দ্জাদে’।

বাংলাদেশের অলিগলি, ক্যাফে, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে শুরু করে বিয়ের আসর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিকী বা বনভোজনের আড্ডায় যে গানটি সবচেয়ে বেশি গীত হয়, তা হলো—‘আবার এল যে সন্ধ্যা’।世代 থেকে世代 ঘুরে আসা এই কালজয়ী গানটি ১৯৭৫ সালে প্রকাশ করেই পুরো দেশে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন হ্যাপি আখান্দ্। বর্তমান ডিজিটাল যুগেও এই গানের আবেদন এতটুকু কমেনি।

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে হ্যাপির চলে যাওয়া ছিল প্রথম বড় আঘাত। প্রয়াত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু প্রায়ই আফসোস করে বলতেন, হ্যাপির প্রয়াণে সংগীতাঙ্গনে যে বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা আজও অপূরণীয়। তবে ফিডব্যাকের গানের কথার মতোই—‘শিল্পীর মৃত্যু নেই’। হ্যাপি আজও বেঁচে আছেন কোটি শ্রোতার হৃদয়ে।

হ্যাপির প্রখর মিউজিক সেন্স ও সুরের সৃষ্টির ক্ষমতা দেখে তাজ্জব বনে যেতেন সহশিল্পীরা। প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শাফিন আহমেদ এক স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, বাদ্যযন্ত্র বা অ্যাকুয়াস্টিক গিটার না থাকলেও পকেট থেকে ম্যাচের কাঠি বের করে তা দিয়েই অনন্য ছন্দ ও সুর তুলে আনতে পারতেন হ্যাপি। যেকোনো জটিল নোট তিনি মুহূর্তে ধরে ফেলতে পারতেন। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সাল থেকে জাতীয় দিবসগুলোতে গণসংগীত গেয়ে নিজের গান চর্চা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে বড় ভাই লাকী আখান্দের সঙ্গে ১৯৭৩ সালে গড়ে তোলেন ব্যান্ড। ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী সেই ব্যান্ড ছাড়াও জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি।

কলকাতায় কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী মান্না দে এবং বিশ্বখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেববর্মনও হ্যাপির গায়কী ও কণ্ঠের মায়াজালে মুগ্ধ হয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ‘কে বাঁশি বাজায় রে’, ‘নীল নীল শাড়ি পরে’, ‘আমি আবার আসব ফিরে’, ‘চল যাই চলে দূরে বহু দূরে’ কিংবা ‘সবাই যখন ঘুমে’-এর মতো অসংখ্য অমর গান তিনি উপহার দিয়েছেন।

১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর এক হিমেল সন্ধ্যায় যখন এই তারাটি নিভে যায়, তখন থমকে গিয়েছিল পুরো দেশের সংগীতাঙ্গন। ১৯৯৩ সালে বড় ভাই লাকী আখান্দের চেষ্টায় প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র একক অ্যালবাম ‘শেষ উপহার’। অ্যালবামের প্রচ্ছদে লেখা ছিল হ্যাপির অন্তরের আকুতি—“বন্ধুরা আমার গান গেয়ো, আমাকে বাঁচিয়ে রেখো”। ভক্ত ও বন্ধুরা তাঁকে ভোলেননি, বছর ঘুরে তাঁর প্রতিটি জন্মদিনে নতুন করে ফিরে আসেন সুরের রাজপুত্র হ্যাপি আখান্দ্।