১৪ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার, ১০:১৯:০৭ অপরাহ্ন


নুসরাত ফতেহ আলী খানের শেষ দিনগুলো
বিনোদন ডেস্ক | ট্রেন্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-১০-১৪ ১৭:১৩:৪৪
নুসরাত ফতেহ আলী খানের শেষ দিনগুলো সংগীতের বরপুত্র উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান I ছবি: সংগৃহীত


কাওয়ালির মুসম্রাট নুসরতের জীবনের অন্তিম অধ্যায়; অসুস্থ শরীর ও ডায়ালিসিসের মাঝেও যেভাবে কাজ করে গেছেন কিংবদন্তি সুফি শিল্পী

       কাওয়ালির সুরের জাদুতে যিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রোতার হৃদয় জয় করেছিলেন, সুফি সংগীতকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়—তিনি পাকিস্তানের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান। প্রাচ্য ও পশ্চিমের গণ্ডি পেরিয়ে পপ থেকে শুরু করে হলিউডের মূলধারার সিনেমায় তাঁর কণ্ঠের জাদু ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে চিরতরে থেমে যায় এই সুরসম্রাটের বর্ণাঢ্য জীবন। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

দীর্ঘ সময় ধরে টানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিহীনভাবে কাওয়ালি পরিবেশন করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। কণ্ঠের নিখুঁত ওঠানামা, তালের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশনার তীব্রতা সবসময় মুগ্ধ করত শ্রোতাদের। কিন্তু জীবনের শেষ দিনগুলোতে শরীর আর আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছিল না। কিডনির জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও সংগীতের ব্যস্ততা ও ক্রিয়েটিভ কাজ থেকে নিজেকে একটুও দূরে সরিয়ে রাখেননি নুসরাত ফতেহ আলী খান।

মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে কিংবদন্তি এই শিল্পীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল পাকিস্তানের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সালমান আহমেদের। গণমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালমান আহমেদ স্মৃতিচারণা করে জানান, সেদিন নুসরাতকে দেখেই তাঁর মনে হয়েছিল শিল্পী শারীরিকভবে ভীষণ ভালো নেই। অসুস্থ ও দুর্বল শরীর নিয়েও তিনি প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সালমানের মনে হয়েছিল নুসরাতের অবিলম্বে কিছুদিন পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া দরকার, কিন্তু সেই বিরতি আর তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। এর মাত্র কসদিনের মধ্যেই তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল নুসরাতের। কিডনি জটিলতার সুচিকিৎসা এবং প্রয়োজনে কিডনি প্রতিস্থাপনের বিষয়টিও চিকিৎসকদের বিবেচনায় ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগেই শারীরিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। যাত্রাপথে লন্ডনে যাত্রাবিরতির সময় তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। ফলে ৯ আগস্ট তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে লন্ডনের বিখ্যাত ক্রমওয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কিডনি জটিলতার পাশাপাশি তাঁর লিভারের মারাত্মক সমস্যা, ডায়াবেটিস ও হেপাটাইটিসের কথা জানান চিকিৎসকেরা।

১৬ আগস্ট সকালে নুসরাতের শারীরিক অবস্থার আরও চরম অবনতি হয়। সে সময়কার পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ‘ডন’-এর প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছিল যে, ওই দিন ভোর চারটার দিক থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয় এবং দ্রুত তাঁকে হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (ICU) স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ‘ডন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৫৭ মিনিটে কিডনি ও লিভারের মারাত্মক জটিলতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর সময় তাঁর পাশেই উপস্থিত ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপক হাজি ইকবাল নকভি, সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াঁদাদসহ গুটিকয়েক ঘনিষ্ঠজন।

মৃত্যুর আগের সেই কঠিন মুহূর্তগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁর সুযোগ্য ভাতিজা ও খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী রাহাত ফতেহ আলী খানও। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার সময় গাড়িতে নুসরাতকে বেশ বিষণ্ন ও চিন্তিত দেখাচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও নতুন একটি অ্যালবাম প্রকাশের উত্তেজনা ও ভাবনা তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এমনকি গাড়িতে বসেই তিনি সেই অ্যালবামের পুরোনো রেকর্ডিং চালিয়ে শুনছিলেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সৃষ্টির নেশা ও কাজের প্রতি এমন নিবেদন প্রমাণ করে, নুসরাত ফতেহ আলী খান কেবল একজন শিল্পীই ছিলেন না, তিনি নিজেই ছিলেন সংগীতের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।