১২ অক্টোবর ২০২৬, সোমবার, ০৫:২৮:৩৭ পূর্বাহ্ন


পেমবার্টন লাইনের ক্ষত ও মিয়ানমার সীমান্ত: সেভেন সিস্টার্সে ঘনীভূত হচ্ছে জটিল সংকট
বিশেষ প্রতিবেদন | আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ট্র্যান্ডনিউজবিডি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২০২৬-০৩-২৩ ২০:৫০:৫৮
পেমবার্টন লাইনের ক্ষত ও মিয়ানমার সীমান্ত: সেভেন সিস্টার্সে ঘনীভূত হচ্ছে জটিল সংকট ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত


ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় 'সেভেন সিস্টার্স' রাজ্যগুলোতে তার বহুমুখী প্রভাব—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি এখন এক ভূ-রাজনৈতিক আগ্নেয়গিরি। ১৮৩৪ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আর বি পেমবার্টনের কলমের টানে অঙ্কিত 'পেমবার্টন লাইন' আজ দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিচ্ছে।

মানুষ বনাম রাষ্ট্র: কৃত্রিম সীমানার অভিশাপ

সীমান্তের দুই পাড়েই বসবাসকারী নাগা, কুকি, মিজো, চিন ও কাচিনরা মূলত একই নৃগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি এক হলেও রাষ্ট্রীয় সীমানা তাদের দুই দেশে ভাগ করে দিয়েছে। ভারতের হিন্দিভাষী মূল ভূখণ্ড কিংবা মিয়ানমারের বামার অধ্যুষিত অঞ্চলের সাথে এই সীমান্তবাসীর সাংস্কৃতিক সংযোগ নেই বললেই চলে। অথচ আজ সেই মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে সীমান্ত প্রাচীর।

অবকাঠামো উন্নয়ন বনাম স্বাধিকারের লড়াই

নয়াদিল্লি বর্তমানে অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরামে দ্রুতলয়ে রেললাইন ও সড়ক সম্প্রসারণ করছে। উদ্দেশ্য—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে এই উন্নয়নের সুফল কতটা স্থানীয়রা পাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, এই রাজ্যগুলোর জিডিপিতে অবদান মাত্র ১ শতাংশের মতো হলেও এদের নিয়ন্ত্রণে ভারতকে বিশাল অঙ্কের সামরিক ব্যয় করতে হচ্ছে।

গৃহযুদ্ধের উত্তাপ ও 'লুক ইস্ট' নীতির স্থবিরতা

২০২১ সাল থেকে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ ভারতের 'লুক ইস্ট' (বর্তমানে অ্যাক্ট ইস্ট) নীতিকে চরম বাধার মুখে ফেলেছে।

  • শরণার্থী সংকট: চিন ও কাচিন প্রদেশ থেকে আসা হাজার হাজার মানুষ মিজোরাম ও মণিপুরে আশ্রয় নিচ্ছে।

  • গেরিলা তৎপরতা: সীমান্তের উভয় দিকে সক্রিয় নাগা ও কুকি বিদ্রোহীদের চলাচল সীমিত করতে ভারত মরিয়া।

  • বাণিজ্যিক ক্ষতি: থাইল্যান্ডমুখী প্রস্তাবিত ১,৪০০ কিলোমিটার ত্রিদেশীয় সড়ক প্রকল্পটি মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতার কারণে ঝুলে আছে। আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের অংশীদারত্ব এখনো ৩ শতাংশের নিচে, যেখানে চীনের প্রভাব প্রায় ২০ শতাংশ।

কাঁটাতারের বেড়া: নিরাপত্তার নামে বিচ্ছেদ

নয়াদিল্লি অনুপ্রবেশ ও বিদ্রোহী দমনের অজুহাতে সীমান্তে নিশ্ছিদ্র প্রাচীর নির্মাণ করছে। যদিও সরকারি তথ্যমতে গত ২৪ মাসে মাত্র ৮৭৮ জন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়েছে, যা বিশাল এই সীমান্তের তুলনায় নগণ্য। স্থানীয়রা মনে করছেন, এই প্রাচীর আসলে তাদের ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ ছিন্ন করার এক রাজনৈতিক হাতিয়ার।