রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় হলেও প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে শ্রমিক মজুরি; জানুয়ারি থেকে বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিতসহ দরকষাকষির মেয়াদ নির্বিশেষে ডিসেম্বরেই নতুন কাঠামো কার্যকরের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
বিশ্ব পোশাক রপ্তানি বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখে টানা পঞ্চমবারের মতো দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে বাংলাদেশ ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে রপ্তানি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই ঈর্ষণীয় সাফল্য সত্ত্বেও তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সূচকে প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে এখনো তলানির দিকেই রয়ে গেছে বাংলাদেশ।
বর্তমানে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা মার্কিন ডলারে দাঁড়ায় প্রায় ১০১ ডলার। প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি রয়েছে কেবল চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কায় (৯০ ডলার)। যেখানে ভিয়েতনামে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১৭৫ ডলার, ভারতে ১৯২ ডলার এবং চীনে ৩৩৭ ডলার। এই প্রেক্ষাপটে জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে নতুন ন্যূনতম মজুরি হিসেবে মাসে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হচ্ছে, যা বর্তমান কাঠামোর চেয়ে প্রায় ১৪০ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের মজুরি বৃদ্ধির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চূড়ান্ত নির্ধারণের সময় শ্রমিকরা প্রায় প্রতিবারই তাদের কাঙ্ক্ষিত দাবির অর্ধেকের কাছাকাছি পেয়েছেন। ২০১৮ সালে শ্রমিক সংগঠনের মূল দাবি ছিল ১৭ হাজার টাকা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা নির্ধারণ করা হয় ৮ হাজার টাকা। এর প্রায় পাঁচ বছর পর ২০২৩ সালে ২৫ হাজার টাকা দাবির বিপরীতে চূড়ান্ত মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর রয়েছে। বিগত প্রায় তিন বছরে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও শ্রমিকদের আয় না বাড়ায় জীবনযাত্রায় তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
পোশাক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি ও শ্রমিকের মজুরি প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নলেজ হাব ইনস্টিটিউট’-এর সভাপতি ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা কখনোই তাদের বাস্তব প্রত্যাশার কাছাকাছি মজুরি পাননি। গত তিন বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বিবেচনায় এবার মজুরি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হওয়া যুক্তিসংগত। তবে পাশাপাশি গত দুই বছরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটে পোশাক খাত যেসব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে, মজুরি নির্ধারণে সেটিও সমানভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।’
মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরে এই পোশাক খাত বিশ্লেষক আরও জানান, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও খোলামেলা হওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, আমাদের দেশে মজুরি বোর্ডে প্রকৃত অর্থে দরকষাকষির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত থাকে এবং প্রশাসনিক বা বাহ্যিক নানা চাপে অনেক সময় শ্রমিক নেতারা যৌক্তিক দাবি আদায়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হন।
রপ্তানি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাংলাদেশ মূলত পরিমাণ-নির্ভর (Volume-based) পণ্য বেশি রপ্তানি করে, যার ফলে মালিকপক্ষের লভ্যাংশ বা প্রফিট মার্জিন তুলনামূলক কম থাকে। তবে যে পরিমাণ লভ্যাংশ অর্জিত হয়, তার আলোকেও মজুরি বৃদ্ধির কিছুটা সুনির্দিষ্ট সুযোগ থেকেই যায়। বিদেশি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের প্রতি আন্তরিক হয় এবং ন্যায্য ক্রয়মূল্য নিশ্চিত করে, তবে শ্রমিকদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ও জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি প্রদান সহজ হবে।’
পোশাক খাতে সম্ভাব্য অসন্তোষ ও অস্থিরতা রোধে ড. মোয়াজ্জেম পরামর্শ দেন যে, নিয়মিত নিয়ম অনুযায়ী জানুয়ারির বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (Annual Increment) থেকে শ্রমিকদের যেন কোনোভাবেই বঞ্চিত করা না হয়। এ ছাড়া ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বিলম্ব হলেও নতুন নির্ধারিত মজুরি যেন আইনানুযায়ী চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকেই ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়।
অন্যদের মধ্যে তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, তৈরি পোশাক খাতে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। তিনি স্পষ্ট জানান, নতুনভাবে গঠিত মজুরি বোর্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে, পোশাক কারখানার মালিকপক্ষ তা মেনে নেবে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বাণিজ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।