টোকিওতে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে অটোমোবাইল, জ্বালানি, প্রযুক্তি, রেল ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় বিনিয়োগের আহ্বান তারেক রহমানের
জাপানের রাজধানী টোকিওতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম’ সংলাপে জাপানি উদ্যোক্তা ও কোম্পানিগুলোর প্রতি বাংলাদেশের পাঁচটি উচ্চ সম্ভাবনাময় ও অগ্রাধিকারমূলক খাতে সরাসরি বিনিয়োগের (FDI) আহ্বান জানিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। খাতগুলো হলো—অটোমোবাইল বা গাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি, উদীয়মান প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, হাই-স্পিড রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক উৎপাদন শিল্প।
বুধবার (২৮ অক্টোবর, ২০২৬) টোকিওতে অবস্থিত ‘জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন’ (JETRO)-এর প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্বখ্যাত টয়োটাসহ প্রায় ৩৫০টি শীর্ষস্থানীয় জাপানি কোম্পানি সফলভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এত সম্ভাবনার পরও বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের নিচে রয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, গত অর্থবছরে জাপানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ১৩৬ কোটি ডলার, যার বিপরীতে জাপান থেকে বাংলাদেশে ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিতে এই বিনিয়োগের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অটোমোবাইল খাতের রূপরেখা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানায় পূর্ণাঙ্গ সংযোজন ও উৎপাদন শুরুর লক্ষ্যে অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটার যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে, তাকে বর্তমান সরকার আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। এই বৃহৎ উদ্যোগটি সফলভাবে বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সুযোগ-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানির অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশবান্ধব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে জাপানি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং, অ্যাডভান্সড রোবোটিকস ও বিশ্বমানের ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক’ প্রতিষ্ঠার কৌশলগত পরিকল্পনার কথা বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরেন তিনি।
যোগাযোগ ও লজিস্টিকস খাতের মহাপরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান জানান, রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ দেশের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও শহরগুলোকে একটি একক সুবিন্যস্ত জালে যুক্ত করতে উচ্চমাত্রার উড়ালপথে (Elevated Expressway) দেশব্যাপী দ্রুগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে আধুনিক রূপান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে আন্তর্জাতিক মানের ‘বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’-এ জাপানি মানদণ্ড নিশ্চিত করে সুমিতোমো করপোরেশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, যেকোনো বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান প্রধান শর্ত—যেমন নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, বিশ্বমানের যোগাযোগ অবকাঠামো, করব্যবস্থার ধারাবাহিকতা এবং শুল্ক ছাড়সংক্রান্ত প্রশাসনিক উদ্বেগ ও জটিলতা দূর করতে তাঁর সরকার দৃশ্যমান সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, কেবল ঐতিহ্যগত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের জন্য বাণিজ্য ও কৌশলগত বিনিয়োগের অংশীদারত্বকে এক নতুন ও স্থায়ী উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ।