কেন্দ্রীয় চরিত্রে একজন প্রতিষ্ঠিত তারকা, অন্যদিকে গল্পের সমান্তরাল গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছে একজন শিশু বা কিশোর। কখনো সেই শিশুর হাতেই বদলে যাচ্ছে নায়কের জীবন, কখনো তার উপস্থিতিই তৈরি করছে গল্পের মূল সংকট, কিশোরকে মনে হচ্ছে ভিলেন! প্রচলিত বাণিজ্যিক ছবির কাঠামোর মধ্যে এমন ব্যতিক্রমী চরিত্র ও গল্পকে জায়গা দিচ্ছে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্প।
সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া ‘ডোন্ট ট্রাবল দ্য ট্রাবল’ ও ‘বাথ্থা’ এই প্রবণতার দুটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দুটি ছবির গল্প, প্রেক্ষাপট, আবহ ও নির্মাণশৈলী আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মিল রয়েছে, তা হলো প্রতিষ্ঠিত তারকাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখেও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে একজন শিশুশিল্পীকে সমান গুরুত্ব দেয়া ।
বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, দক্ষিণ ভারতে সাধারণত তারকাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক ছবির জন্য পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে গল্পের প্রয়োজনে চরিত্র, বয়স, সম্পর্ক, ঘরানা ও বর্ণনাশৈলী নিয়ে নানা ধরনের নিরীক্ষা দেখা যাচ্ছে। কখনো শিশু হয়ে উঠছে গল্পের চালিকাশক্তি, কখনো একজন সাধারণ মানুষ, কখনো অপ্রচলিত কোনো সম্পর্ক, আবার কখনো একেবারে ভিন্নধর্মী কোনো সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক সংকট।
এগুলোকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সিনেমার উদাহরণ হিসেবে না দেখে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার গল্প বলার পরিবর্তিত প্রবণতার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
একজন ম্যাজিশিয়ান ও এক রহস্যময় শিশুর গল্প
২০২৬ সালের ২ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া তেলুগু ফ্যান্টাসি-অ্যাডভেঞ্চার ছবি ‘ডোন্ট ট্রাবল দ্য ট্রাবল’ পরিচালনা করেছেন শশাঙ্ক ইয়েলেটি। ছবিটি উপস্থাপন করেছেন এস এস রাজামৌলি। প্রযোজনায় রয়েছে ‘বাহুবলী’খ্যাত আরকা মিডিয়াওয়ার্কসের সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা দল। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফাহাদ ফাসিল এবং শিশুশিল্পী সারাহ পালেকার।
ছবির গল্পে ফাহাদ ফাসিল অভিনয় করেছেন সুরি নামের একজন প্রতারক ও ম্যাজিশিয়ানের চরিত্রে। জাদু দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানানোই তার কাজ। ঘটনাচক্রে তার জীবনে আসে দিব্যা নামের এক রহস্যময় কিশোরী। মেয়েটির সঙ্গে পরিচয়ের পর সুরির জীবন অদ্ভুত সব ঘটনার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জানা যায়, মেয়েটির মধ্যে রয়েছে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা।
এখানে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দিব্যা শুধু একজন পার্শ্বচরিত্র নয়। তার উপস্থিতি থেকেই মূল কাহিনির গতি তৈরি হয়। সুরির ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রতারণার জগৎ এবং মেয়েটির রহস্যময় পরিচয় সবকিছু মিলিয়ে গল্প এগিয়ে যায়।
ফাহাদ ফাসিলের মতো প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার পাশাপাশি একজন শিশুশিল্পীকে গল্পের এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সাহসি সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে ফ্যান্টাসি, কমেডি, অ্যাডভেঞ্চার ও আবেগের মিশ্রণে নির্মিত একটি বাণিজ্যিক ছবিতে শিশুচরিত্রকে কেন্দ্রীয় গল্পের অংশ করে তোলা নির্মাতার ভিন্নধর্মী চিন্তার পরিচয় দেয়।
এক গ্যাংস্টার ও আট বছরের শিশুর অদ্ভুত সম্পর্ক
একই সময়ে মুক্তি পেয়েছে তামিল ছবি ‘বাথ্থা’। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া ছবিটি পরিচালনা করেছেন বালাজি তারানিথারন। কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন বিজয় সেতুপতি। তার বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ শিশুচরিত্রে অভিনয় করেছেন সাই পৃথ্বিরাজ।
ছবিটির পটভূমি ১৯৮৬ সালের মাদ্রাজ। বিজয় সেতুপতি অভিনয় করেছেন বাথ্থা নামের একজন ভয়ংকর স্থানীয় গ্যাংস্টারের চরিত্রে। এলাকায় তার প্রভাব, ক্ষমতা ও ভয়ের পরিবেশ রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে আট বছর বয়সী একটি স্কুলছাত্র, যার জীবন স্কুল, বাড়ি, পড়াশোনা ও শৈশবের ছোটখাটো দুশ্চিন্তায় সীমাবদ্ধ।
একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনায় শিশুটির কারণে গ্যাংস্টার বাথ্থা স্কুলের একটি পরিত্যক্ত শৌচাগারে আটকা পড়ে। এরপর শুরু হয় দুজন মানুষের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। একজন ক্ষমতাধর অপরাধী, অন্যজন অসহায় শিশু- দুজনের বয়স, মানসিকতা, জীবনবোধ ও সামাজিক অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। অথচ পরিস্থিতি তাদের একসঙ্গে থাকতে বাধ্য করে।
এখানে নির্মাতা চমৎকার একটি গল্পের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। সাধারণত গ্যাংস্টারনির্ভর বাণিজ্যিক ছবিতে প্রতিপক্ষ, গ্যাং ও ক্ষমতার লড়াইকে কেন্দ্র করে গল্প এগোয়। কিন্তু ‘বাথ্থা’ সেই পরিচিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে একজন গ্যাংস্টারের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ককে গল্পের প্রধান চালিকাশক্তি করেছে।
শিশুটির উপস্থিতি গ্যাংস্টারের জীবনে একধরনের আত্মোপলব্ধি তৈরি করে। তার ক্ষমতা, ভয়, অহংকার ও অপরাধজগতের বাইরে গিয়ে সে নিজের মানবিক দিকটির মুখোমুখি হয়।
এখানে শিশুটি কেবল নায়কের জীবন পরিবর্তনের উপলক্ষ নয়; তার নিজস্ব ভয়, সাহস, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিত্বও গল্পে গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে ছবিটি একই সঙ্গে গ্যাংস্টার ড্রামা, ফ্যামিলি ড্রামা, কমেডি এবং মানবিক সম্পর্কের গল্প হয়ে উঠেছে। ‘বাথ্থা’র বিশেষত্ব হলো, একজন প্রতিষ্ঠিত তারকার পাশাপাশি শিশুশিল্পীকে অভিনয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট জায়গা দেয়া হয়েছে। ছবিটির সমালোচনায়ও এই সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ও দুই চরিত্রের পারস্পরিক পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
যেখানে শিশুই নায়ক!
২০২৬ সালের ১৯ জুন মুক্তি পাওয়া মালয়ালম ছবি ‘বালান-দ্য বয়’ এই আলোচনায় আরেক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পরিচালনা করেছেন চিদাম্বরম।
এখানে কোনো প্রতিষ্ঠিত সুপারস্টারকে কেন্দ্রীয় নায়ক করা হয়নি। বরং একজন শিশুকে সরাসরি গল্পের প্রধান চরিত্র হিসেবে রাখা হয়েছে। অভিনয় করেছেন অধিশেশন কে. আর. এবং ফারজানা পালাথিঙ্গাল। পরবর্তী বয়সের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মুহাম্মদ জিনান এবং টোভিনো থমাসও গুরুত্বপূর্ণ অংশে রয়েছেন।
গল্পে একজন মা ও তার সন্তান নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বারবার পরিচয় পরিবর্তন করে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করে। মা প্রতিবার সন্তানকে নতুন পরিচয়, নতুন অতীত ও নতুন গল্পের সঙ্গে পরিচিত করান। শিশুটির চোখ দিয়ে দর্শক দেখতে পান বেঁচে থাকার সংগ্রাম, ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানুষের প্রতি বিশ্বাসের পরিবর্তন।
ছবিটির গল্পের কাঠামোও ব্যতিক্রমী। শিশুটির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রটির জন্য আলাদা অভিনেতা ব্যবহার করা হয়েছে। একই চরিত্রের শৈশব ও কৈশোরকে দুই শিল্পীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু শিশুচরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া নয়, তার বয়স ও মানসিক পরিবর্তনকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় তুলে ধরার জন্যও নিরীক্ষা করা হয়েছে। এটি একটি সারভাইভাল থ্রিলার, কিন্তু এর আবেগীয় কেন্দ্র মা ও সন্তানের সম্পর্ক।
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় এসব কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা!
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় শিশু বা কিশোর চরিত্রকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখার প্রবণতা শুধু এই দুটি ছবিতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের আরও কয়েকটি ছবি দেখলে বোঝা যায়, নির্মাতারা প্রচলিত নায়ক বা নায়িকা-নির্ভর গল্পের বাইরে গিয়ে ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক ও চরিত্রের সমন্বয় ঘটাচ্ছেন। এর বাইরেও রয়েছে এমন আরও উদাহরণ।
উপরে উল্লিখিত চলচ্চিত্র ও আরো কিছু চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্মাতারা শুধু দর্শকের পরিচিত বিনোদনের চাহিদা পূরণ করছেন না, একই সঙ্গে নতুন ধরনের গল্প, চরিত্র ও সম্পর্কের সঙ্গে দর্শককে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। একটি বাণিজ্যিক ছবির নায়ক যে সব সময় প্রতিষ্ঠিত তারকা হবেন, গল্প যে সব সময় প্রাপ্তবয়স্কদের সংকট ঘিরে এগোবে, কিংবা বিনোদনের জন্য যে প্রচলিত অনুসরণ করতেই হবে- এই ধারণাগুলোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে এসব সিনেমা। তারা বারবার প্রমাণ করছেন, শেষ পর্যন্ত সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি তার গল্প। আর গল্পের প্রয়োজনে যখন একজন আট বছরের শিশু একজন গ্যাংস্টারের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে, কিংবা একজন রহস্যময় কিশোরী একজন প্রতারক ম্যাজিশিয়ানের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে, তখন বোঝা যায়, বাণিজ্যিক সিনেমায় নিরীক্ষার ক্ষেত্রটা আসলে কতটা বিস্তৃত।